গল্পে ফিরে যান

কর্মজীবী নারী

Posted 2 months ago
এক ব্যাংকের ইন্টাভিউ বোর্ডে এক চাকরীপ্রার্থী মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

"আপনার পোস্টিং যদি রংপুর, দিনাজপুর বা কুমিল্লায় হয় তাহলে কি আপনি সেখানে যেতে পারবেন?"

মেয়েটি সংগে সংগে উত্তর দিয়েছিল, "অবশ্যই পারব?"

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,

"পরিবার থেকে কোন বাঁধা আসবে না তো?"

মেয়েটি সামান্য হেসে বলল,

"স্যার, আমার হাজবেন্ড অনেক সাপোর্টিভ, সে বলেছে বাংলাদেশের যেখানেই আমার পোস্টিং হোক না কেন, আমি যেতে পারব"

আমি আচমকা তাকে বলে বসলাম,

"আপনি আপনার হাজবেন্ডকে এখনই ফোন করে খুশির খবরটা দিন যে আপনার চাকরিটা হয়ে গেছে এবং আপনার পোস্টিং হবে কুমিল্লা শহরে"

মেয়েটা অবাক হয়ে গেল। খুশিতে প্রায় কান্না করে দেয় অবস্থা। তারপর রুম থেকে বের হয়ে গেল তার হাজবেন্ডকে খবরটা জানাতে। আমিও পরবর্তী ক্যান্ডিডেটকে ডেকে নিলাম ইন্টারভিউ এর জন্য।

মিনিট দশেক পর মেয়েটা আবার রুমে এসে ঢুকল। তার চোখমুখ থমথমে। বসতে বললাম। বসেই কেঁদে দিয়ে বলল,

"স্যার, আমার হাজব্যান্ড আমাকে কুমিল্লা যেতে দেবে না"

আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বললাম,

"আপনি না বলেছিলেন যে আপনার বাসা থেকে কোন আপত্তি নেই"

মেয়েটি মাথা নিচু করে নি:শব্দে চোখের পানি ফেলতে লাগল।

আমি আমার সামনে থাকা ফাইলে তার নামের পাশে লিখা কুমিল্লা কেটে দিয়ে ঢাকা লিখে দিলাম।

আমি জানি হয়ত আমি বলে এই কাজটি করেছি। কারন মেয়েটার রেজাল্ট ভাল ছিল এবং বেশ সপ্রতিভ ছিল। মনে হয়েছিল সে তার প্রফেশনে ভাল করবে। আমার জায়গায় অন্য কেউ হয়ত এই কাজটা নাও করতে পারত।

অনেকদিন পর জানতে পারি মেয়েটা এখন ব্যাংকের হেড অফিসে একটা গুরুত্বপুর্ন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছে।

আমি আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে তাকে সামান্য এগিয়ে দিয়েছিলাম, ট্র‍্যাকে তুলে দিয়েছিলাম। বাকী পথ সে তার নিজের যোগ্যতায় পাড়ি দিয়েছে।

আমি দীর্ঘদিন কর্পোরেট দুনিয়ায় কাজ করেছি। আমি দেখেছি মেয়েরা কাজে কর্মে ভীষন সিনসিয়ার। যতক্ষন অফিসে থাকে ততক্ষন তারা কাজই করে।

আমি তাদের ঢাকার বাইরে ফ্যাক্টরি ভিজিট করতে পাঠাতাম। তারা ঘুরে এসে চমৎকার রিপোর্ট জমা দিত। কয়েকজন এসে আমার ধন্যবাদ দিত কারন আমিই নাকি প্রথম তাদের অন্য শহরে ভিজিট করতে পাঠিয়েছি। আমি এমনও এক পুরুষ সহকর্মীকে বলতে শুনেছি যে মেয়েদের ঢাকার বাইরে ভিজিটে পাঠালে তাদের পাহারা দিতে আরেকজন ছেলে দিতে হয়। তারচে ছেলে পাঠানোই ভাল।

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একটা কথা বেশ ভালভাবেই মনে করে যে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের দিয়ে পুরুষের সমান কাজ করানো যায় না। আমি তা পুরোপুরি দ্বিমত পোষন করি।

আমার ডিভিশানে এক মেয়ে কাজ করত। অন্য এক ডিভিশানে তার হাজবেন্ড কাজ করত। মেয়েটা মাঝেমাঝে ছুটি নিত তার ছোট বাচ্চাটা অসুস্থ হলে। অথচ তার হাজবেন্ডকে দেখতাম দিব্যি হাসিমুখে অফিস করে যাচ্ছে।

আমার স্ত্রীও একজন চাকরীজীবি। আমার মেয়ে অসুস্থ হলে সেই ছুটি নিত আর আমি অফিস করতাম। বাচ্চা অসুস্থ হলে মায়েরা ছুটি নেবে-এটাই যেন নিয়ম। কারন কোন মা'ই বাসায় অসুস্থ বাচ্চা রেখে কাজে যেতে পারে না। বাবারা পারে। বাবা মা শশুর শাশুড়ি সবার দেখভালের দায়িত্ব যে তার কাঁধে।

একটা মেয়ে যখন চাকরিতে প্রবেশ করে তখন হয় সে সদ্য বিবাহিত অথবা সদ্য মা হয়েছে বা সামনে বিয়ে হবে। তার মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন হবে। সেটা কম বেশী ছয় মাস। তার আগে পরেও ছুটি লাগতে পারে। এগুলো নিয়েও অফিসে অফিসে কানাঘুষা চলে। অনেক বস প্রকাশ্যেই অসন্তষ্টি প্রকাশ করেন। প্রমোশনের লিস্ট থেকে একটা ছেলের নাম বাদ দেয়ার চেয়ে একটা মেয়েকে বাদ দেয়া বসদের জন্য তুলনামুলক ভাবে কম স্ট্রেসের বিষয়।

এভাবে ৪-৫ বছর পর মেয়েরা যখন পূর্ন গতিতে কাজ শুরু করে, তখন আর তাকে থামানো যায় না। আমার দেখা মতে মেয়েরা চাকরী শুরু করার পর থেকেই পিছিয়ে পড়ে। কেউ কেউ পরে সেই পিছিয়ে পরা কাভার করতে পারলেও বাকিরা পারে না। আর যে পারে তাকে আর কেউ ছুঁতে পারে না।

এই যখন অবস্থা, যেখানে মেয়েরা সমাজ সংসারের দ্বায়িত্ব নিয়ে চাকরিতে বৈসম্যের শিকার, সেখানে আপনি যদি বলেন এখন থেকে মেয়েরা ৮ ঘন্টার জায়গায় ৫ ঘন্টা কাজ করবে তাহলে গোটা কর্পোরেট জগতে মেয়েদের কি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

কোন প্রতিষ্ঠানই এমন কাউকে চাইবে না যে ৫ ঘন্টা কাজ করে চলে যাবে। তাহলে বাকী ৩ ঘন্টার কাজ কে করবে? দীর্ঘদিন কর্পোরেট জগতে কাজ করে এসেছি। দেখেছি মেয়েরা এমনিতেই বৈষম্যের শিকার। তার ওপর এই ফর্মুলা তাদের কর্মক্ষেত্রে গ্রহনযোগ্যতা কমাবে এবং সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে দেবে। কর্পোরেট মারপ্যাঁচে মেয়েরা স্রেফ হিমসিম খাবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কর্মজীবী কোন মেয়েই এমন প্রিভিলেজ চায় না। তারা পারলে কাজ দুই ঘন্টা বেশী করবে, কম না।

দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে অর্থনীতির মূল ধারা থেকে সরিয়ে দিতে এমন মায়া মায়া দুষ্টু বুদ্ধি কারা দেয় আপনারা তা জানেন।

বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীরা এই ফাঁদে পা দিবেন না বলেই আমার বিশ্বাস।

কথাগুলো যদি হৃদয় ছুঁয়ে যায়, শেয়ার করুন।

কথাগুলো পড়ার পর যদি মনে দাগ কাটে—তাহলে আপনার অনুভূতিটাও জানিয়ে যান।

মন্তব্যসমূহ (0)

No comments yet. Be the first to comment!